ইসলাম শিক্ষা
আকাইদ

ঈমান

পাঠ 1

ইমান (الإيمان)

ইমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসকেই ইমান বলা হয়। প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসূল, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদি বিষয় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়াই হলো ইমান। যে ব্যক্তি এসব বিষয়কে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন তিনি হলেন মুমিন।

ইমানের তিনটি দিক রয়েছে। এগুলো হলো—

ক. অন্তরে বিশ্বাস করা;

খ. মুখে স্বীকার করা এবং

গ. তদনুসারে আমল করা।

অর্থাৎ ইসলামের যাবতীয় বিষয়ের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমল করার নাম হলো ইমান। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য এ তিনটি বিষয় থাকা জরুরি। কেউ যদি শুধু অন্তরে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে স্বীকার না করে তবে ইমানের অস্তিত্ব থাকলেও সে প্রকৃত ইমানদার বা মুমিন হিসেবে গণ্য হয় না। আবার মুখে স্বীকার করে অন্তরে বিশ্বাস না করলেও কোনো ব্যক্তি ইমানদার হতে পারে না। বস্তুত আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমলের সমষ্টিই হলো প্রকৃত ইমান।

ইমানের ছয়টি বিষয়ের বিবরণ

ইমান বা বিশ্বাসের মৌলিক বিষয় মোট ছয়টি। মুমিন হওয়ার জন্য এ ছয়টি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। আমরা পূর্বের শ্রেণিতে ইমানে মুফাসসাল সম্পর্কে জেনেছি। তাতে ইমানের ছয়টি বিষয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ পাঠে আমরা বিস্তারিতভাবে এ ছয়টি বিষয় সম্পর্কে জানব।

১. মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস

ইমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হলো আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাদের রব, মালিক, সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা, সাহায্যকারী, জন্ম ও মৃত্যুর মালিক। তিনি সকল গুণের আধার। তিনি পবিত্র, ক্ষমাশীল, দয়াবান, পরম দয়াময়, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান, সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।

আল্লাহ তায়ালা অনন্ত অসীম। তিনি সবসময় ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। তার সত্তা ও গুণাবলি অতুলনীয়। তিনি ঠিক তেমনিই যেমনভাবে তিনি বিরাজমান। তার অসংখ্য সুন্দর নাম রয়েছে। তার পিতা, পুত্র এবং স্ত্রী, কন্যা নেই। তিনিই একমাত্র সত্তা। তার সমকক্ষ, সমতুল্য বা শরিক কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা ও ইবাদত একমাত্র তারই প্রাপ্য। আল্লাহ তায়ালাকে তার সত্তা, গুণাবলি ও সকল ক্ষমতাসহ বিশ্বাস করাই হলো ইমানের সর্বপ্রধান বিষয়।

২/২

আকাইদ

২. ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস

ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার জিকির ও তাসবিহ পাঠে রত। তাঁরা আল্লাহ তায়ালার আদেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত।

ফেরেশতাগণ অদৃশ্য। তবে আল্লাহ তায়ালার আদেশে তাঁরা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন। তাঁরা পুরুষ নন আবার নারীও নন। তাঁদের আহার-নিদ্রার প্রয়োজন নেই। তাঁদের সংখ্যা অগণিত। একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কেউই তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা জানে না। ফেরেশতাগণের মধ্যে ৪ জন হলেন প্রসিদ্ধ। তাঁরা হলেন হযরত জিবরাইল (আ.), হযরত মিকাইল (আ.), হযরত আজরাইল (আ.) এবং হযরত ইসরাফিল (আ.)।

৩. আসমানি কিতাবের প্রতি বিশ্বাস

মানবজাতির কল্যাণের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবি-রাসূলগণের নিকট আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন। এগুলো হলো আল্লাহ তায়ালার পবিত্র বাণীসমষ্টি। এসব কিতাবে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় পরিচয় ও ক্ষমতার বর্ণনা প্রদান করেছেন। মানুষের জীবনযাপনের জন্য নানা আদেশ-নিষেধ প্রদান করেছেন। এ কিতাবগুলো আসমানি কিতাব নামে পরিচিত। আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসূলগণের মাধ্যমে এসব কিতাব আমাদের নিকট পৌঁছিয়েছেন।

আসমানি কিতাবসমূহের মধ্যে প্রসিদ্ধ চারটি কিতাব চারজন প্রসিদ্ধ রাসূলের ওপর অবতীর্ণ হয়। মুসা (আ.)-এর ওপর 'তাওরাত', দাউদ (আ.)-এর ওপর 'জাবুর', ঈসা (আ.)-এর ওপর 'ইনজিল' এবং মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর 'কুরআন মাজিদ' অবতীর্ণ হয়। ছোটো আকারের আসমানি কিতাবকে বলা হয় সহিফ।

৪. নবি-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস

মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বহু নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন। তাঁরা সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় শিক্ষা দিতেন। কোন পথে চললে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে তা দেখিয়ে দিতেন। নবি-রাসূলগণ ছিলেন মানবজাতির মহান শিক্ষক। আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে বিশেষভাবে মনোনীত করেছেন। তাঁরা ছিলেন নিস্পাপ। সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা সর্বাধিক।

সর্বপ্রথম নবি ছিলেন হযরত আদম (আ.)। আর সর্বশেষ নবি ও রাসূল হলেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। তিনি সাইয়েদুল মুরসালিন বা রাসূলগণের সর্দার। তিনি আমাদের নবি, ইসলামের নবি। আমরা তাঁরই উম্মত।

৫. আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস

আখিরাত হলো পরকাল। দুনিয়ার জীবনের পর মানুষের আরও একটি জীবন রয়েছে। এ জীবন স্থায়ী ও অনন্তকালব্যাপী। এটাই হলো পরকাল। আখিরাত বা পরকালের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। কিয়ামত, কবর, পুনরুত্থান, হাশর, মিয়ান, সিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি আখিরাত জীবনের একেকটি স্তর। আখিরাত হলো কর্মফল ভোগের স্থান।

১০৩৬

ইসলাম শিক্ষা

পুনরুত্থান আখিরাত জীবনেরই একটি অংশ মৃত্যুর পর আমাদের পুনরায় জীবিত করা হবে। দুনিয়ার প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে সকলকেই আল্লাহ তায়ালা জীবিত করবেন। একেই বলা হয় পুনরুত্থান। এ সময় সবাই হাশরের ময়দানে সমবেত হবে। আল্লাহ তায়ালা সেদিন প্রত্যেকের নিকট নিজ নিজ আমলের হিসাব চাইবেন। আমাদের সেদিন তার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সেখানে পাপ-পুণ্যের ওজন করবেন, হিসাব নেবেন। তিনিই হবেন একমাত্র বিচারক। অতঃপর ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দ কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে।

৬. তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস

তাকদির অর্থ ভাগ্য। তাকদির আল্লাহ তায়ালা থেকে নির্ধারিত। ভালো-মন্দ যা কিছু হয় সবই আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হয়। সুতরাং দুনিয়াতে ভালো কিছু লাভ করলে আনন্দে আত্মহারা হওয়া যাবে না। বরং এটি মহান আল্লাহরই দান। তাই আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। অন্যদিকে বিপদে-আপদে বা কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হলে হতাশ হওয়া যাবে না। এর জন্য অন্যায় ও দুর্নীতি করা যাবে না। বরং এটিও আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকেই এসেছে। সুতরাং এ অবস্থায় সবর বা ধৈর্যধারণ করতে হবে। মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতে হবে। অতএব আমরা তাকদিরে বিশ্বাস করব এবং সাধ্যমতো নেক কাজ করব।

উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস করা অপরিহার্য। এগুলোর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমল করলে আমরা প্রকৃত মুমিন হতে পারব।

ইমান আনার সুফল

ইমান আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। ইমানের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারে। মুমিন ব্যক্তি দুনিয়াতে শ্রদ্ধা, সম্মান, কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করেন। সকলেই তাঁকে ভালোবাসে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِلرَّسُولِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ

অর্থ: আর সম্মান তো কেবল আল্লাহ, তার রাসূল এবং মুমিনদের জন্যই (সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ৮)।

মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসূলের (সা.) প্রিয়পাত্র। মহান আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ভালোবাসেন। আখিরাতে তিনি মুমিনদের চিরশান্তির জান্নাত দান করবেন। মুমিনগণ সেখানে চিরকাল থাকবেন। জান্নাতের সকল নিয়ামত ভোগ করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا خَالِدِينَ فِيهَا

আকাইদ

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে তাঁদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১০৭-১০৮)।

আমরা ইমানের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে পড়ব। এ সম্পর্কে জানব এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করব। অতঃপর এগুলোর অনুসরণ করে নিজ জীবন গড়ে তুলব। আমরা সবসময় নেক কাজ করব। কখনো অন্যায় ও অত্যাচার করব না। এভাবে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও সফলতা লাভ করতে সক্ষম হব।

কাজ : শিক্ষার্থীরা-

  • ক. ইমানের ছয়টি বিষয় লিখে একটি পোস্টার তৈরি করে শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপন করবে।
  • খ. ইমানের ছয়টি বিষয়ের বিবরণ বাড়ি থেকে খাতায় লিখে এনে শিক্ষককে দেখাবে।
  • গ. দলে বিভক্ত হয়ে ইমান আনার কী কী শুভ পরিণাম রয়েছে তার একটি তালিকা তৈরি করে শ্রেণিতে উপস্থাপন করবে।
পরবর্তী: নিফাক